
মোঃ তরিকুল ইসলাম/ইমাম হোসেন ইমন গোপালগঞ্জ থেকে ফিরেঃ গোপালগঞ্জ থানাপাড়া এলাকায় নবনির্মিত বহুতল বিশিষ্ট ভবনে স্থাপিত আরাফ জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এমবিবিএস চিকিৎসক ডাঃ রাবেয়া বেগমের (২১০৬২৬৮৮৭) বিরুদ্ধে পরিপূর্ণ যাচাই-বাছাই না করে এক প্রসূতির ভুল সিজার এবং সিজার পরবর্তী পেশাগত দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা ও গাফিলতির কারণেট মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযুক্ত ডাঃ রাবেয়া বেগম গোপালগঞ্জ-২ আসনে বিএনপি মনোনীত এমপি প্রার্থী ডাঃ কে এম বাবরের সহধর্মিণী।
অপর দিকে ভুল সিজারে নিহত তিশা মণি (১৯) সে গোপালগঞ্জ পৌর এলাকার গেটপাড়া কবরস্থান রোডের মৃত আকবর মুন্সির পুত্রবধূ ও সুমন মুন্সির সহধর্মিণী ছিলেন।
এই ঘটনায় এলাকা জুড়ে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে নিহতের পরিবারের পুরুষ সদস্যদের পক্ষ থেকে সেখানে তথ্য সংগ্রহের জন্য উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদেরকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহে বাঁধা দিতে দেখা গেছে।
নিহত প্রসূতির ঘনিষ্ঠ স্বজনদের ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় সন্তান প্রসবের জন্য তিশা মণিকে তার স্বজনেরা আরাফ জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডাঃ রাবেয়া বেগমের তত্ত্বাবধানে সিজারের জন্য ভর্তি করেন। পরে গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) সকালে প্রথম দফা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার পর রোগীর শরীরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে থাকে।
পরবর্তীতে ওই ডাক্তার বিশেষজ্ঞ কোন চিকিৎসকের পরামর্শ বা সহযোগিতা না নিয়ে বিকাল ৩ টায় পুনরায় আবারো অপারেশন করে রক্তক্ষরণ বন্ধ করার চেষ্টা করেন। তাতেও রোগীর শরীরের রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় ওই দিন রাত ৮ টার দিকে মুমূর্ষ অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্স যোগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন।
রুগির অবস্থার অবনতি দেখা দেওয়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে রুগিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রেরন করে। ওই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিশা মণি মারা যান।
এদিকে ওইদিন সন্ধ্যায় লাশ গোপালগঞ্জ এসে পৌঁছালে তার স্বজনদের মাঝে চাপা দুঃখ, ক্ষোভ ও হতাশা দেখা যায়।
মৃত প্রসূতির একাধিক স্বজনেরা জানান, অপারেশন করতে গেলে ভুল হতেই পারে কিন্তু তার মানে সকালে প্রথমবার যখন ভুল অপারেশন হয়েছে তারপর সে পরামর্শ করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে অথবা উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত ঢাকা পাঠালে আল্লাহ পাকের রহমতে হয়তোবা সে জানে বেঁচে যেত। কিন্তু এই ডাক্তারের অদক্ষতায় এবং দায়িত্ব ও কর্তব্যে চরম অবহেলার কারণে আমরা আমাদের আদরের তিশা মণিকে হারালাম। ওর অবুঝ সন্তান দুটো আজ এতিম হলো। ডাক্তার রাবেয়া বেগমের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা না নিলে কাল হয়তো আরো অনেক মায়ের সন্তানেরা এতিম হবে। আমরা আল্লাহর ওপর বিচার ছেড়ে দিলাম।
পরে নিহত তিশা মণিকে পবিত্র জুম্মার নামাজের পর গেট পাড়া কবরস্থানে জানাজার নামাজের পর দাফন করা হয়।
এ সময় ডাঃ কে এম বাবর তার জানাজা নামাজে শরীক হন এবং সেখানে তিনি বলেন, যদি সে এমপি পদে নির্বাচিত হতে পারেন তাহলে নিহত তিশা মণির স্বামীকে একটা চাকুরীর ব্যবস্থা করে দিবেন।
এ বিষয়ে সাধারণ জনগণ ও সচেতন মহলের দাবি, কোন প্রসূতির সিজারের পূর্বে যেন অবশ্যই বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে অভিজ্ঞ ও উক্ত বিষয়ে পারদর্শী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দ্বারা যেন তা সম্পন্ন করা হয়। তা না হলে দেশে ভুল চিকিৎসার খেসারত দিতে গিয়ে অকালে আরো অনেক প্রসূতি মায়ের প্রাণ চলে যেতে পারে।
এ ব্যাপারে গোপালগঞ্জ বিএনপির নেতা সিরাজুল ইসলাম সিরাজের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, একজন ডাক্তারের কাজ মানুষের জীবন বাঁচানো, জীবন কেড়ে নেওয়া নয়। সেখানে ডাঃ বাবর এবং তার ডাঃ স্ত্রী যা করেছেন তা ঠিক নয়। এটা একটা অপরাধ। এটা কখনোই আমাদের কাম্য নয়। আমি এ ঘটনায় দোষিদের শাস্তি কামনা করছি।
এ ব্যাপারে গোপালগঞ্জ-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুজ্জামান ভুইয়া লুটুলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এটা খুবই দুঃখ জনক ঘটনা। রোগিরা সুস্থ হতে ডাক্তারের কাছে আসেন। ভুল চিকিৎসায় রোগির মৃত্যু এটা কখনোই আমাদের কাম্য নয়। আমি আশা করি এ ঘটনা সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচার হওয়া উচিত।
এ ব্যাপারে গোপালগঞ্জ-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এইচ খান মঞ্জু বলেন, ডা. কে এম বাবরের স্ত্রী ডাক্তার এটা আমার জানা নেই। তার সম্পর্কে আমি কি মন্তব্য করবো, তবে মানুষের মুখে শুনেছি সে এমবিবিএস ডাক্তার না, তাহলে সিজার করে মানুষ মেরে ফেলা এটা অন্যায়। আমি এ ঘটনা সঠিক ভাবে তদন্তের জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ডা. রাবেয়া বেগমের ব্যবহৃত মোবাইল-০১*৮৯**৫৩৮২ নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি প্রসূতির আত্নীয়-স্বজনদের সাথে টাকার বিনিময়ে মিটমাট করা হয়েছে। তাদের কোন অভিযোগ নেই। এছাড়াও গোপালগঞ্জের স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথেও মিটমাট করা হয়েছে যেন এ ব্যাপারে নিউজ না হয়। তিনি আরো বলেন, বিষয়টা আমার স্বামী ডাঃ কে এম বাবর দেখতেছে। আমি এ ব্যাপারে আর কি বক্তব্য বা মন্তব্য করবো। আমি কিছু বললে দু’রকম কথা হতে পারে। তাই এ ব্যাপারে আপনি আমার স্বামী ডাঃ বাবরের সাথে কথা বলুন।
অভিযুক্ত ডাঃ রাবেয়া আক্তারের স্বামী গোপালগঞ্জ-২ আসনে বিএনপি মনোনীত এমপি প্রার্থী ডাঃ কে এম বাবরের ব্যবহৃত ০১৭১২-৬*৫*৪* নম্বরে বার বার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি।